| |

জাপানে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের ধারা

প্রবীর বিকাশ সরকার

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার অর্জনের আগেই বহির্বিশ্বের যে দেশটিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সংবাদ পাওয়া যায় সেটি প্রাচ্যের জাপান। এই দেশে বিগত শতবর্ষ ধরে যে সকল জাপানি বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও অনুবাদ করে আসছেন তাঁদের অধিকাংশেরই সূচনা এবং অনুপ্রেরণা  ‘তাগো-রু’ বা  ‘টেগোর’ অর্থাৎ ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।

মনে করা হয় আধুনিককালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জাপানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূচনাকাল ১৯০২। এ বছর জাপানের নমস্য পণ্ডিত শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন কলকাতায় যান এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে। কলকাতায় প্রায় দশ মাস অবস্থানের পর ওকাকুরা জাপানে ফেরার সময় ‘মল্লিক’ নামে একটি কিশোরকে জাপানে নিয়ে এসেছিলেন। ছেলেটি জাপানি ভাষা ও জুজুৎসু ক্রীড়া শিখে ছয় মাস পর স্বদেশে ফিরে যায় ওকাকুরার শিষ্য শিল্পী য়োকোয়ামা তাইকানের সঙ্গে ১৯০৩ সালে। ওকাকুরা শেষ বয়সে বাংলার নারীকবি প্রিয়ম্বদা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রণয়বন্ধনে আবদ্ধ হলে বাংলা ভাষা শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন একটি চিঠিতে। তেমনি তরুণ চিত্রশিল্পী মুকুলচন্দ্র দের সঙ্গেও যদি জাপানি তরুণী ‘ওকিও’র প্রেম হতো তাহলে ওকিও নিশ্চয়ই বাংলা ভাষা কিছু হলেও শিখতেন। মুকুল দে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান সফরের সঙ্গী হয়েছিলেন। ওকাকুরা ১৯১২ সালেও কলকাতা ভ্রমণ করেছিলেন। কবিগুরু ১৯০১ সালেই জাপান ভ্রমণের ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেটা সম্ভব হয় ১৯১৬ সালে। তাঁর এই ভ্রমণ সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে জাপান-বাংলা দ্বিপাক্ষিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর যা আজও বিদ্যমান।

প্রকৃতপক্ষে জাপানের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক সূচিত হয়েছিল ওকাকুরার ভারত ভ্রমণেরও আগে। মেইজি যুগের (১৮৬৮-১৯১২) ১৮৭৭ সালে কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সন্তান এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তের আত্মীয়  রাজা স্যার শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরকে জাপানের মিকাদো তথা মেইজি সম্রাট মুৎসুহিতো তাঁকে কিছু জাপানি বাদ্যযন্ত্র উপহার প্রদান করেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে ছিল বাঁশি, অর্গান, বীণা, হার্প এবং নানা আকৃতির ঢাক যাকে বলে ‘তাইকো’। শৌরীন্দ্রমোহনও অনুরূপ তিনটি ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র উপহার হিসেবে জাপানে প্রেরণ করেছিলেন। সেগুলো রাজকীয় জাদুঘরে স্থান পাওয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে টোকিও জাদুঘর নির্মিত হলে পরে সেখানে স্থানান্তরিত হয়। এবং বহু বছর যাবৎ সেগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হতো। শৌরীন্দ্রমোহন ছিলেন সঙ্গীতরসিক মানুষ। তিনি বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাস লিখেছিলেন। আবার দেশ-বিদেশের বাদ্যযন্ত্র দিয়ে নিজস্ব জাদুঘরও গড়েছিলেন। সুতরাং বলা যায় সুর ও শব্দের মাধ্যমে জাপান-বাংলা সম্পর্কের ভিত্ রচিত হয়েছিল আজ থেকে ১৪১ বছর পূর্বে। ওকাকুরা এবং রবীন্দ্রনাথ এই সম্পর্ককে বিচিত্র বর্ণে ও সুরে চিত্রায়িত ও সুররঞ্জিত করে গেছেন।

রাজা শৌরীন্দ্রমোহনের পর ১৮৮৩ সালে জাপানের কিউশুউ অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী বৌদ্ধপণ্ডিত পুরোহিত কিতাবাতাকে দোওরিউ তিব্বত হয়ে বুদ্ধগয়া যান। সেখান থেকে ফেরার পথে কলকাতা বন্দরে এসে জাহাজে চড়েন। এখন পর্যন্ত তিনিই মনে হয় তখন প্রথম জাপানি নাগরিক যিনি কলকাতা তথা অবিভক্ত বাংলার মাটিতে পা রাখেন যদিও বাংলা ভাষা না জানার কারণে তাঁকে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছিল।

এই ঘটনার বছর দশেক পরে ১৮৯৩ সালে আরেকজন বাঙালি স্বামী বিবেকানন্দ জাপান হয়ে আমেরিকায় যান বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে যোগদানের জন্য। জাপানে তিনি এক সপ্তাহের বেশি অবস্থান করেছিলেন। তখন প্রাক্তন প্রাচীন রাজধানী নারা নগরের এক বৌদ্ধমন্দিরে সংস্কৃত ভাষার পূর্বজ রূপ ‘সিদ্ধাম’ বা  ‘সিদ্ধান্তমাত্রিকা’ অক্ষর লিখিত হচ্ছে দেখে আশ্চর্য হয়েছিলেন! সিদ্ধাম অক্ষর অনেকটাই বাংলা অক্ষরের মতো। আজও তেনদাইশুউ, শিনগোনশুউ বৌদ্ধ সদায়ের সমাধিতে কাঠের ফলকে সিদ্ধাম ভাষায় মন্ত্রাদি লিখিত হয়ে থাকে।

১৯০৩ সালে কর্মের সন্ধানে ১৪ হাজার জাপানি নাগরিক বহির্বিশ্বে গমন করেন। প্রায় ১২ হাজার উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় স্থায়ী অভিবাসী হন। বাকিরা অন্যান্য দেশে। এদের মধ্যে ২৪ জন তৎকালীন ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন। মনে হয় তাঁদের একজন ছিলেন জাপানের আইচি-প্রিফেকচারের নাগোয়া শহরের অধিবাসী উয়েমোন তাকেদা। কলকাতায় কোনো কাজের সংস্থান করতে না পেরে ঢাকায় যান। একজন রসায়নবিদ এবং সাবান তৈরির কারিগর বলে পরিচিত ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় সাবানের কারখানা স্থাপন করেন এবং ঢাকাতেই এক ব্রাহ্ম সমাজের মেয়ে হরিপ্রভা মল্লিককে বিয়ে করেন ১৯০৭ সালে। পরবর্তীতে তার অনুজ সোয়েমোন তাকেদাও ঢাকাতেই ‘রানি’ নামে একটি মেয়েকে বিয়ে করে পরে কলকাতায় স্থায়ী হন। কর্মজীবন এবং সাংসারিক কারণে তাঁদেরকে বাংলা শিখতে হয়েছিল। ১৯০৩ সালে ওকাকুরা তাঁর দুজন প্রধান ও প্রিয় শিষ্য চিত্রশিল্পীদ্বয় য়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুনসোওকে কলকাতায় পাঠান। তাঁরা সেখানে কয়েক মাস শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু প্রমুখের সঙ্গে শিল্পকলা বিষয়ে ভাববিনিময় করেন, নিশ্চয়ই বাংলা ভাষার অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছিল।

জাপানে না এলেও রবীন্দ্রনাথ সামুরাই সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিষয়ে অবগত হয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে তিনি ছাত্রছাত্রীদেরকে শারীরিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য জুদোও বা জুজুৎসু চালু করতে আগ্রহী হন। তাঁর অনুরোধে ১৯০৫ সালে সুহৃদ ওকাকুরা জুদোও প্রশিক্ষক সানো জিননোসুকেকে শান্তিনিকেতনে পাঠান। একই সালে চিত্রশিল্পী শোওকিন কাৎসুতা শান্তিনিকেতনে যান সব ব্যবস্থা করে দেন ওকাকুরা। আবার এই সালেই রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে দারুশিল্প প্রশিক্ষক কুসুমোতো, পরবর্তীকালে আরও দুজন কিনতারোও কাসাহারা এবং কোওনো শান্তিনিকেতনের শ্রীনিকেতনে পল্লী উন্নয়নে কাঠের কাজ শেখাতে যান। তেমনি সঙ্গীতভবনে যান সঙ্গীত শিখতে শিজুএ ইরি, গেনজিরোও মাসু, মিকিও মাকি প্রমুখ। তাঁরা সকলেই বাংলা ভাষা পুরোপুরি না জানলেও অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন বলা বাহুল্য। তবে অসামান্য কাজ করেছেন সানো জিননোসুকে বাংলা থেকে জাপানি ভাষায় গোরা  উপন্যাসটি অনুবাদ করেন ১৯২৪ সালে, প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯০৭ সালে জাপানের বৌদ্ধপণ্ডিত কিমুরা রিউকান বা কিমুরা নিক্কি পালি ভাষা শেখার জন্য চট্টগ্রামের মহামুনি মহাস্থবির বৌদ্ধ মন্দিরে যান। ১৯১১ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি ও সংস্কৃত ভাষায় ভর্তি হন। এই সাল থেকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার তথা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন। ১৯১৮-২৬ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি প্রভূত দক্ষতা অর্জন করেছিলেন বাংলা ভাষায়। জাপানে রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দোভাষীর কাজও করেছিলেন।

এরপর ১৯১১ সাল এবং ১৯১২ সালে যথাক্রমে জাপানি বৌদ্ধপণ্ডিত ভিক্ষু কাওয়াগুচি একাই এবং অধ্যাপক ও বৌদ্ধধর্ম গবেষক তাকাকুসু জুনজিরোও ভারতে যান। কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তাঁদের। পরবর্তীকালে ১৯২৯ সালে জাপান ভ্রমণকালে তাকাকুসুকে রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধধর্মীয় পবিত্র ‘ধম্মপদ’ গ্রন্থ থেকে একটি বাণী স্বহস্তে লিখে  উপহার প্রদান করেন যা তাকাকুসু প্রতিষ্ঠিত প্রসিদ্ধ মুসাসিনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত হচ্ছে, ২০১১ সালে এই লেখক কর্তৃক সেটা আবিষ্কৃত হয়।

১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে চিত্রশিল্পী কাম্পো আরাই কলকাতায় যান এবং দুবছর বিচিত্রাভবনে শিল্পকলা শিক্ষা দেন। তাঁর সঙ্গে যান চিত্রশিল্পী নাম্পু কাতায়ামা। এঁরা ছাড়া আরও যান একাধিক চিত্রশিল্পী কোয়ো ইশিজুকা, কোওসেৎসু নোওসু, ছেনরিন কিরিয়া, ইমামুরা শিকোও প্রমুখ। শান্তিনিকেতনে যান রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে জাপান প্রবাসী বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জাপানি স্ত্রীর মাসতুতো বোন মাকি হোশি ঐতিহ্যবাহী ইকেবানা বা ফুলসজ্জা এবং চাদোও বা চা অনুষ্ঠান প্রশিক্ষণ দেবার জন্য। ১৯২৯ সালে যান আরেকজন জুদোও প্রশিক্ষক শিনজোও তাকাগাকি শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর অনুরোধে, ব্যবস্থা করেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ওওকুরা কুনিহিকো। ১৯১৬ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ ভক্ত মাদাম তোমি কোরা কবির দোভাষী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের একাধিক কবিতা ও প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন তিনি ইংরেজি থেকে, নিজেও তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। জাপানের আন্তর্জাতিক কবি রবীন্দ্রনাথের বন্ধু নোগুচি য়োনেজিরোও ১৯৩৫ সালে শান্তিনিকেতনে কবিকে দেখতে যান। নোগুচি বাংলা অঞ্চল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালি নারীকে নিয়ে কবিতাও লিখেছেন জাপানে ফিরে এসে। এই সালে তোমি কোরাও যান। এর আগে ১৯৩৪ সালে শান্তিনিকতনে সংস্কৃতভাষার অলঙ্কারবিদ্যা শিক্ষা লাভ করেন অধ্যাপক ৎসুশোও বিয়োদোও। এ রকম আরও একাধিক কবি, গবেষক, চিত্রশিল্পী ও সাহিত্যিক কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে যাওয়া-আসা করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। অবশ্য বাঙালিও অনেকে জাপান সফর করেন। এতে বোঝা যায় জাপান-বাংলা সম্পর্কের গভীরতা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাঁচবার জাপান ভ্রমণের সময় বাংলায়ও বক্তৃতা করেছেন। সুতরাং বাংলা ভাষা সম্পর্কে তৎকালীন জাপানি সমাজে একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল। জাপানের বিখ্যাত কবি ও শিশুসাহিত্যিক কেনজি মিয়াজাওয়ার ছোটবোন কলেজ ছাত্রী তোশি মিয়াজাওয়া রবীন্দ্রনাথকে বাংলা ও ইংরেজি গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়ে তাঁকে অবাক করে দিয়েছিলেন ১৯১৬ সালে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলা ভাষা নিয়ে ব্যাপক অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। মূলে মূলত রবীন্দ্রনাথ। উল্লেখ্য যে, যুদ্ধপূর্ব সময়ে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি গ্রন্থ গীতাঞ্জলি, গার্ডনার, ক্রিসেন্ট মুন, পোস্ট অফিস, কিং অব ডার্ক চেম্বার, স্ট্রে বার্ড, সেক্রিফাইস প্রভৃতিসহ তাঁর বক্তৃতা যথাক্রমে ‘রিয়ালাইজেশন অব লাইফ’, ‘দি ম্যাসেজ অফ ইন্ডিয়া টু জাপান’, ‘ন্যাশনালিজম অন অরিয়েন্টাল কালচার অ্যান্ড জাপানিজ মিশন’, ‘ক্রিয়েটিভ ইউনিটি’, ‘ফিলসফি অব লেইজার’ ইত্যাদি অনুবাদ হয়ে যায়।

১৯৪১ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কোনো কাজের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং এর প্রভাবের কারণে। যুদ্ধপূর্ব ধারাবাহিকতা পুনরায় জীবন ফিরে পায় ১৯৬১ সালে সাড়ে তিন বছর লাগিয়ে ঘটা করে উদযাপিত শততম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে (১৯৫৭-৬১)। এই উপলক্ষে প্রচুর রবীন্দ্র রচনা জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়। বহুভাষাবিদ অধ্যাপক ওয়াতানাবে শোওকো মূল বাংলা থেকে গীতাঞ্জলি জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। রবীন্দ্রনাথের জাপান যাত্রী গ্রন্থটি অধ্যাপক কিজো ইনাজু ও সন্দ্বীপ ঠাকুর জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন যৌথভাবে। অধুনালুপ্ত অ্যাপলনশা প্রকাশনা সংস্থা রবীন্দ্ররচনার অনূদিত রচনাবলি কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করে। এই উৎসব উপলক্ষে একটি রবীন্দ্র আন্দোলনই গড়ে ওঠে জাপানে। বাংলা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমও চালু করেছিলেন রবীন্দ্রভক্তরা। রবীন্দ্রনাথের গান জাপানি ভাষায় গীত হয়ে রেকর্ড পর্যন্ত প্রকাশিত হয়।

১৯৬৬ সালে গঠিত হয় ‘বাংলা ভাষা পাঠচক্র’ নামে একটি সংস্থা। এক ঝাঁক তরুণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমীর আবির্ভাব ঘটে। বাংলা শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন বাংলা ভাষায় পিএইচডিপ্রাপ্ত অধ্যাপক ৎসুয়োশি নারা; জাপান প্রবাসী কলকাতার  লেখক, গবেষক ও বহুভাষাবিদ কল্যাণ দাশগুপ্ত, চট্টগ্রামের সাংবাদিক ইসকান্দর আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ। কল্যাণী নামে একটি অনিয়মিত পত্রিকাও প্রকাশিত হয় জাপানি ভাষাতে তাতে একজন বা একাধিক মিলে জনপ্রিয় বাংলা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস মূল বাংলা থেকে অনুবাদ করে প্রকাশ করতে থাকেন। কল্যাণী এখনো প্রকাশিত হয়ে থাকে। এই নবোদ্যোগের শুরুতে বাংলা ভাষা শিখে অধ্যাপক কাজুও আজুমা অনুবাদ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থটি। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের বাংলা চণ্ডালিকা, মুক্তধারা ও নটীর পূজা পাঠ করে গবেষণামূলক প্রবন্ধও লেখেন।

সত্তর দশক থেকে বাংলা ভাষার একটা অভূতপূর্ব জোয়ার আসে জাপানে। আমূল পরিবর্তন ঘটে। অনেক জাপানি বাংলা ভাষা শেখার জন্য ঢাকা, কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে যান। এবার শুধু রবীন্দ্রসাহিত্য নয়, বাংলা ভাষাচর্চাকে উপলক্ষ করে বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ইতিহাস-নৃতত্ত্ব-সাহিত্য-শিল্পকলা-সঙ্গীত-অর্থনীতি-রাজনীতি-বাণিজ্য ইত্যাদি শিক্ষা ও গবেষণা করার প্রবণতা দেখা দেয়। বাংলা ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করেন যথাক্রমে অধ্যাপক ড.ৎসুয়োশি নারা, অধ্যাপক তোমিও মিজোকামি ও সেইজোও আওইয়াগি। অধ্যাপক আজুমা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে তিন বছর অধ্যাপনা করার পর জাপানে ফিরে এসে গঠন করেন ‘টেগোর অ্যাসোসিয়েশন-জাপান’ ১৯৭১ সালে পরবর্তীকালে এর নতুন নাম রাখা হয় ‘ভারত-জাপান রবীন্দ্র সংস্থা।’ রবীন্দ্রনাথের প্রবীণ ভক্তদের নিয়ে তিনি একাধিক পরিকল্পনা হাতে নেন। তার মধ্যে মূল বাংলা ভাষা থেকে বাংলা সাহিত্যের জাপানি অনুবাদ প্রকল্প। শিশুসাহিত্যিক ও অনুবাদক ইয়ামামুরো শিজুকা, অধ্যাপক হিরোশি নোমা, অধ্যাপক মোরিমোতো তাৎসুও এবং অধ্যাপক কাজুও আজুমার যৌথ সম্পাদনায় ১২ খণ্ডে সাত হাজার পৃষ্ঠাসম্বলিত রবীন্দ্ররচনাবলি জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়ে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। দ্বাদশ খণ্ডটি গবেষণাধর্মী। এই পরিকল্পনা ১৯৭৫ সালে নেয়া হয়েছিল। এই রচনাবলির তিন পঞ্চমাংশ রচনা মূল বাংলা থেকে অনূদিত। এই বিশাল মাপের ঐতিহাসিক কাজটি সম্ভব হয়েছে অধ্যাপক কাজুও আজুমার অশেষ ধৈর্য, আগ্রহ এবং রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে।

রবীন্দ্রনাথের যে সকল উল্লেখযোগ্য রচনা মূল বাংলা থেকে অনুবাদ হয়েছে সেগুলো যথাক্রমে :

অধ্যাপক ৎসুয়োশি নারা : সেঁজুতি, আকাশ প্রদীপ, নবজাতক, দালিয়া, বুদ্ধদেব, সাহিত্য, জাভা যাত্রীর পত্র ও চিঠিপত্র।

মাসাইউকি ওনিশি : শিশুতীর্থ, নষ্টনীড়, মনিহার, খাতা, রবিবার, তাসের দেশ, ল্যাবরেটরি, ডাকঘর, চঞ্চলা, দান, মুক্তি, ছবি, শাহজাহান, প্রশ্ন, আমি ও ঘরে বাইরে।

মাসাইউকি উসুদা : জীবিত ও মৃত এবং শেষের কবিতা।

তামোৎসু নাগাই : দুঃসময়, ফুলের ইতিহাস, কল্যাণী, নিরুদ্দেশ যাত্রা, সমুদ্রের প্রতি, কণ্টকের কথা, অচল স্মৃতি, ক্ষুদ্র আমি, কাগজের নৌকো, স্বপ্ন ও ধুলামন্দির।

তোমিও মিজোকামি : শান্তি, প্রায়শ্চিত্ত, মাস্টারমশাই, তপস্বিনী, সংস্কার ও মধ্যবর্তিনী।

কাজুয়ে ইয়ানাগিসাওয়া : ওইখানে, মা এবং তারাপ্রসন্নের কীর্তি।

কাজুহিরো ওয়াতানাবে : দৃষ্টিদান।

শিনইয়া কাসুগাই : দুর্বুদ্ধি, নামঞ্জুর, গল্প, বলাই, স্ত্রীর পত্র, চিত্রকর ও বদনাম।

সেইজো আওইয়াগি : মুসলমানির গল্প।

কোওজি সাদাইয়ে : শেষের রাত্রি এবং পাত্র ও পাত্রী।

কাজুমারো হানাওয়া : অপরিচিতা।

ইয়ায়ে নাকাদা : আশ্রমের শিক্ষা।

আতাকো নোমা : প্রতিবেশিনী, রাসমণির ছেলে এবং দিদি।

কিকুকো সুজুকি : ঠাকুরদা।

নাওকি নিশিওকা : রবিবার। বাংলাতেও তিনি লেখেন ভারতীয় লোকসাহিত্য গ্রন্থ অরণ্যের রাজবাড়ি নামে।

তোমাকো কাম্বে : শিশু (৬৪টি কবিতাসহ কয়েকটি গান), পুরনো বট এবং নদী।

কেইকো আজুমা : গল্পসল্প।

কাজুও আজুমা : পুনশ্চ, প্রান্তিক, গোরা, চার অধ্যায়, আত্মপরিচয়, চিঠিপত্র, জীবনদেবতা, নৈবেদ্য, গীতাঞ্জলি; বলাকার কয়েকটি কবিতা; সভ্যতার সঙ্কট, শেষ লেখা, পত্রপুটের কয়েকটি কবিতা; আমার সোনার বাংলা, জনগণমন অধিনায়ক, আশ্রমসঙ্গীত ও গীতবিতানের কয়েকটি গান। যৌথ অনুবাদ, চতুরঙ্গ। এছাড়া অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল বিজয়ী জাপানি ঔপন্যাসিক কাওয়াবাতা ইয়াসুনারির বিখ্যাত উপন্যাস নিজি বাংলায় অনুবাদ করেন ইন্দ্রধনু নামে যা কলকাতার দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ষাট দশকের দিকে।

মোরিমোতো তাৎসুও : পূববী, রোগশয্যায়, আরোগ্য, শেষলেখা, দুইবোন ও নটীর পূজা।

রচনাবলীর দ্বাদশ খণ্ডে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলা ভাষাভিত্তিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন যথাক্রমে : অধ্যাপক ড. ৎসুয়োশি নারা, অধ্যাপিকা নিওয়া কিয়োকো তিনি রবীন্দ্রনাথ ও জাপান সম্পর্ক নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত, অধ্যাপক মাসাইউকি উসুদা এবং অধ্যাপক কাজুও আজুমা। এতে বাংলায় প্রবন্ধ লিখেছেন যথাক্রমে: শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায়, ভবতোষ দত্ত, রবীন্দ্রনাথ গুপ্ত, অজিতকুমার ঘোষ, অশ্রুকুমার সিকদার, সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হায়াৎ মামুদ, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, রামবহাল তেওয়ারী, আরতি মুখোপাধ্যায়, প্রকাশকুমার নন্দী ও স্বপনপ্রসন্ন রায়। এগুলোর জাপানি অনুবাদ করেন যথাক্রমে: কাজুমারো হানাওয়া, কাজুহিরো ওয়াতানাবে, ৎসুয়োশি নারা, নাওকি নিশিওকা, কেইকো আজুমা ও নিওয়া কিয়োকো।

এছাড়া মাসাইউকি উসুদা, নাওকি নিশিওকা ও কাজুও আজুমা যৌথভাবে সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবীন্দ্র চিত্রকলা: রবীন্দ্র সাহিত্যের পটভূমি গ্রন্থটি জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন।

রবীন্দ্রনাথের বাইরে বাংলা ভাষার প্রধান কবি, সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিকদের রচনাও বাংলা থেকে জাপানিতে অনূদিত হয়েছে যেমন :

নিওয়া কিয়োকো : তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচিত গল্প সংগ্রহের অনুবাদসহ ডাইনীর বাঁশি, আখড়াইয়ের দীঘি, ঘাসের ফুল, নারী ও নাগিনী, খড়গ, মালাচন্দন, রায়বাড়ি, জলসাঘর ও কবি প্রভৃতি। সুকুমার রায়ের মধ্যরাতের ভয়ঙ্কর, অবাক জলপান, আশ্চর্য ছবি ও লোলিল পাহারা। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা সমগ্র থেকে সাতটি কবিতা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা সমগ্র থেকে চারটি কবিতা। কাজী নজরুল ইসলামের ৩৬টি কবিতা। মহাশ্বেতা দেবী ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র গল্প সংকলন। এছাড়া শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী ও আল মাহমুদের ২০ এর অধিক কবিতার অনুবাদ নিয়ে ‘বাংগুরাদেশু শি ছেনশুউ’ বা  ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত কবিতা’ নামে একটি গ্রন্থ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

মাসাইউকি উসুদা : জীবনানন্দের ৬১টি কবিতা নিয়ে রূপসী বাংলা। বিচ্ছিন্ন কবিতা হায় চিল, নির্জন সাক্ষর, কমলালেবু, আট বছর আগের একদিন। বুদ্ধদেব বসুর ঘুমের গান। ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা।

তামোৎসু নাগাই : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী। বিচ্ছিন্ন কবিতা জীবনানন্দের বনলতা সেন, নির্মলেন্দু গুণের মানুষ, লজ্জা, রোদ উঠলেই সোনা, প্রথম অতিথি; প্রেমেন্দ্র মিত্রের নীল দিন; বুদ্ধদেব বসুর কোনো মৃত্যুর প্রতি, সমরেশ বসুর অবাধ্য, পসারিণী ও সমর সেনের বিস্মৃতি ও বিরহ।

তোশিইউকি ইয়ামাদা : বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টন।

কাজুহিরো ওয়াতানাবে : বুদ্ধদেব বসুর আড্ডা।

হিরোকো ইয়ামাদা : নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বীতংস।

কিকুকো সুজুকি : যোগীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের রামপ্রসাদ; দীনেশচন্দ্র সেনের ময়মনসিংহ গীতিকা; দেওয়ান মদীনা মনসুর, সুরুৎজান বিবি, সুন্দরী কমলা এবং বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টান; হুমায়ুন আজাদের ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, আব্বুকে মনে পড়ে। কবি মুকুন্দরাম দাস বিষয়ে প্রবন্ধ। উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯৮৮ সালে বার্ষিক কাগজ সোকা বা উজানযাত্রী প্রকাশ করেন যেটা শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যবিষয়ক কাগজ জাপানি ভাষায় প্রকাশিত। বর্তমানে অনিয়মিতভাবে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোগাওয়া মাসাহিকো কর্তৃক প্রকাশিত হচ্ছে।

মেগুমি মায়েমুরা : আসাদ চৌধুরীর গ্রামবাংলার গল্প ও শঙ্খ ঘোষের ছড়া সব কিছুতেই খেলনা নয়।

মারিকো উচিয়ামা : সত্যজিৎ রায়ের দশটি গল্পের অনুবাদকৃত গ্রন্থ। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর টুনটুনির বই।

মাসাইউকি ওনিশি : সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পালকীর গান; জীবনানন্দের হওয়ার রাত, মহাশ্বেতা দেবীর নুন। শামসুর রাহমান, আবুল হাসান ও শহীদ কাদরীর কবিতা।

কেইকো আজুমা : স্বর্ণকুমারী দেবীসহ একাধিক বাঙালি মহিলার জীবন, কর্ম বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ।

তোমিও মিজোকামি : শরৎচন্দ্র চট্টেপাধ্যায়ের গল্প অনুবাদ করেছেন বলে জানা যায়।

ওকুদা ইউকা : রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সম্প্রতি গানের সিডি প্রকাশ করেছেন। বাংলায় একাধিক লেখা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে।

অধ্যাপক কাজুও আজুমা বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে জাপানি সাহিত্যের উষ্ণতর ভাববিনিময়ের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার মধ্যে বিশ্বভারতীতে প্রতিষ্ঠিত ‘নিপ্পন ভবন’, কলকাতার সল্টলেকে‘ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র : রবীন্দ্র-ওকাকুরা ভবন’ তার উজ্জ্বল প্রমাণ। বাংলাদেশের সিলেটে অনুরূপ প্রকল্প ‘জাপান-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ২০০৭ সালে কিন্তু বিপুল পরিমাণ তহবিল সহযোগী এক বাঙালি কর্তৃক আত্মসাতের কারণে তা ভেস্তে গেছে।

জাপানে বাংলাভাষা ও সাহিত্য এবং রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দেবার জন্য তাঁর নিরলস  বিপুল শ্রম ও উৎসর্গমর্মিতা বিস্ময় জাগায়! অনুবাদ, গবেষণা, শিক্ষকতার বাইরে টোকিওতে ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে দুটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন সাফল্যের সঙ্গে সম্পাদন করেন। রবীন্দ্রনাথের বাংলা গীতাঞ্জলির ছন্দ নিয়ে তিনি ব্যাপক গবেষণা করেন। বাংলা সাংস্কৃতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসের দৃষ্টিতে রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণ শীর্ষক গবেষণামূলক অভিসন্দর্ভ  তাঁর  অতুলনীয় মেধার পরিচয় বহন করছে। শুধু তাই নয়, বাংলা বর্ণপরিচয় শেখার জন্য তিনি একটি অনন্যসাধারণ সচিত্র শিশুপাঠ্য পুস্তকও রচনা করেন কাজুও আজুমা বেঙ্গলি নামে ১৯৯৮ সালে। তাছাড়া অতিসম্প্রতি তাঁর বাড়িতে পরিত্যক্ত কাগজপত্রের মধ্যে একটি দুর্লভ দলিলের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক ৪২ পৃষ্ঠার একটি ডিমাই সাইজ প্রকাশনা যার নাম হচ্ছে : ‘হিগাশি পাকিসুতান নি ওকেরু বেনগারু গো তো বেনগুরু বুনগাকু নো কেনকিউ’ তথা ‘পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের গবেষণা।’ গ্রন্থটি থেকে জানা যাচ্ছে যে, ১৯৬৩ সালের ২২ শে সেপ্টেম্বর  থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে [বাংলা ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যের এক সপ্তাহ] শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেটা উপস্থাপনা করেছিলেন তৎকালীন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খ্যাতিমান ধ্বনিতত্ত্ববিদ মুহাম্মদ আবদুল হাই। তিনি তাঁর দীর্ঘ উপস্থাপনাবক্তব্যে [বাংলা ভাষার গবেষণা এবং অধ্যাপনা] বিষয় তুলে ধরেন। ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আলোচনা করেন [প্রাচীন বাংলা সাহিত্য] সম্পর্কে, ড.মুহাম্মদ এনামুল হক আলোচনা করেন [মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য] এবং সৈয়দ আলী আহসান আলোচনা করেন [সমকালীন বাংলা সাহিত্য] সম্পর্কে।

এই চারজনের ৪টি প্রবন্ধ জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন যথাক্রমে সেইজোও আওইয়াগি এবং কাজুও আজুমা ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসের ২০ তারিখে। গ্রন্থটির তৃতীয় প্রচ্ছদে উল্লেখিত তথ্যাদি থেকে জানা যায় এটা প্রকাশ করেন দুজনেই  বেনগারু বুনগাকু বুনকা কেনকিউ কাই (বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্থা) এর পক্ষ থেকে, যার দপ্তর ছিল টোকিও কিয়োইকু দাইগাকু গেনগো কেনকিউ শিৎসু নাই (টোকিও শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা গবেষণা অধিদপ্তর) বুনকিয়োকু ওয়ার্ডের ওওৎসুকা শহরে। মনে হচ্ছে অধ্যাপক আজুমারাই এই সংস্থাটি গঠন করেছিলেন। উপরোক্ত বাঙালি চারজন অধ্যাপকের সঙ্গে তখন তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, বাংলা ভাষার প্রতি অধ্যাপক আজুমার দরদ কতখানি গভীর ছিল। এমন নজির খুব বেশি একটা বহির্বিশ্বে নেই।

সাম্প্রতিককালে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে বাংলা ভাষা ক্রমশ গুরুত্ববহ হয়ে উঠছে বহির্বিশ্বে। তোকাই বিশ্ববিদ্যালয়, ওসাকা বিশ্ববিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শেখানো হচ্ছে। ২০১২ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা ভাষা শেখার কার্যক্রম চালু হয়েছে এটা একটা যুগান্তকারী ঘটনা যদিও তা এতদিন পর্যন্ত হিন্দিভাষা অনুষদের অধীনে ছিল। এই সুদীর্ঘ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাসকে অমরতা দিয়েছেন প্রাচ্যভাতৃত্ববাদের (প্যান-এশিয়ানিজম) উদ্গাতা ওকাকুরা তেনশিনের আমৃত্যু অনুসারী বাংলাপ্রেমী অধ্যাপক কাজুও আজুমা। নিঃসন্দেহে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম এই ধারাকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করবে ভবিষ্যতে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।

বাংলা ট্রিবিউন