| |

প্রথম কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী

নবীগঞ্জ থেকে উত্তম কুমার পাল হিমেল

নবীগঞ্জের সুদীপ চক্রবর্তী বাংলাদেশের একজন তরুণ নাট্যশিল্পী ও শিক্ষক। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাজ্য সরকার প্রদত্ত সম্মানসূচক কমনওয়েলথ স্কলারশিপ ২০১৭ লাভ করেছেন। চলতি সেপ্টেম্বর থেকে গোল্ডস্মিথস্, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের থিয়েটার ও পারফরম্যান্স বিভাগে পিএইচডি অধ্যয়ন শুরু করবেন। নাট্যকলা অধ্যয়নে বাংলাদেশ থেকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পাওয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি।

সুদীপ চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৮০ সালে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জে। প্রয়াত বিমল চক্রবর্তী ও পার্বতী চক্রবর্তীর মেজো সন্তান তিনি। শৈশব, কৈশোর গড়িয়ে তারুণ্যের শুরুটা নবীগঞ্জেই। নবীগঞ্জ শিবপাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়, যোগল-কিশোর উচ্চ বিদ্যালয় ও নবীগঞ্জ কলেজে পড়াশুনা করেন তিনি। কলেজে ভর্তি হবা বিভাগে পরপরই খেলার প্রতি আগ্রহ পরিবর্তিত হয়ে নাট্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় রূপ নেয়। জাহাঙ্গীর রানার উৎসাহে সহপাঠি বন্ধুরাসহ ‘থিয়েটার শাখাবরাক’ গঠন করে নাট্যচর্চা শুরু করেন ১৯৯৬ সালে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ পাওয়া দিয়ে ভিন্ন অধ্যায়ের যাত্রা শুরু হয় তাঁর ১৯৯৯ সালে। নাট্যকলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্ত উভয় ক্ষেত্রে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অর্জন করে একই বিভাগে ২০০৬ সালে খন্ডকালীন শিক্ষকতা ও ২০০৮ সালে পূর্ণকালীন অধ্যাপনা শুরু করে ২০১৪ সাল থেকে প্রায় ৩ বছর বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মশালা পরিচালনা, নাট্য নির্দেশনা ও পরিকল্পনা এবং গবেষণা তাঁর অন্যতম লক্ষ্যে পরিণত হয়।

বিগত দেড় দশকে সুদীপ চক্রবর্তী বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস্, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে আন্তর্জাতিক নাট্য কর্মশালা, সেমিনার ও নাট্যোৎসবে অংশ নিয়ে নতুন ও ভিন্ন মাত্রার শিল্পরীতির সাথে পরিচিত হন। তাঁর ২৫টি নির্দেশিত নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চাকা, রক্তকরবী, দক্ষিণা সুন্দরী, প্রণয় যমুনা, মহাজনের নাও, লাল জমিন, ফণা, গহনযাত্রা, ম্যাকবেথ, শেক্সপিয়র সপ্তক, জ্যোতিসংহিতা, বিভাজন, পাইতাল প্রভৃতি। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নাট্যদল প্রযোজিত প্রায় ৫০ নাটকের মঞ্চ, আলো, পোশাক, দ্রব্য ও মুখোশ পরিকল্পনা করেছেন তিনি। সমাদৃত হয়েছে তাঁর নবরূপায়ণে মঞ্চস্থ হওয়া থিয়েটার-এর কালজয়ী নাটক সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় এবং আব্দুল্লাহ আল মামুনের রচনা ও ফেরদৌসী মজুমদারের একক অভিনীত কোকিলারা। যুক্তরাজ্যে ২০তম কমনওয়েলথ গেমস নাট্যোৎসব, কন্টাক্ট থিয়েটার নাট্যোৎসব, চিকেনশেড নাট্যোৎসব, সিজন অব বাংলা ড্রামা, দক্ষিণ কোরিয়ায় কিওচাং নাট্যোৎসব এবং ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র-ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন রাজ্যের নাট্যোৎসবে তাঁর নির্দেশিত নাটক আমন্ত্রিত ও প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশের দেশজ নাট্যকলা ও নাগরিক নাট্যকলা বিষয়ক তাঁর গবেষণা প্রবন্ধসমূহ বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশ করেছে।

পরিশ্রমলব্ধ, সৃজনশীল ও বৈচিত্রপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সুদীপ চক্রবর্তী দেশে ও বিদেশে সম্মাসনূচক থিয়েটার অ্যাওয়ার্ড ও শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। বাংলাদেশে নাট্যচক্র প্রবর্তিত ‘সার্জেন্ট আহাদ পদক’, থিয়েটার-এর ‘জাকারিয়া স্মৃতি পদক’, নাট্যধারা-এর ‘তনুশ্রী পদক’, জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের ‘নাট্যপার্বণ পদক’, থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘সোলায়মান প্রণোদনা’, ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটার প্রবর্তিত ‘ফওজিয়া ইয়াসমিন শিবলী পদক’, যুক্তরাজ্যের ‘কন্টাক্ট থিয়েটার’ শিক্ষাবৃত্তি, ‘থিয়েটার রয়েল স্ট্রাটফোর্ড ইস্ট’-এর ইমার্জিং আর্টিস্ট আমন্ত্রণ এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘চার্লস ওয়ালেস আর্টিস্ট ভিজিটিরশিপ অ্যাওয়ার্ড’, ‘নিউটন রিসার্চার লিঙ্ক ট্রাভেল গ্র্যান্ট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন তিনি। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রাঙ্কলিন বিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে নিউ জার্সি কিন বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউইয়র্ক সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২০১৫ সালে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আমন্ত্রণে বক্তৃতা ও কর্মশালা পরিচালনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, “বিদ্যমান বিশ্ব বাস্তবতায় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা মোকাবিলা করার জন্য ‘স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নাট্যকলা পাঠ্যভূক্ত’ ও ‘রাষ্ট্রের অর্থায়নে নাট্যদল’ গঠন করা জরুরী। শিক্ষা ও সংস্কৃতির যথাযথ ও টেকসই বিকাশই কেবল চলমান ও ভবিষ্যৎ বিপর্যয় ঠেকাতে পারে।”